নিজস্ব প্রতিবেদক: গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল (ই/এম) জোনে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ঘুষ-বাণিজ্য, পদোন্নতি নিয়ন্ত্রণ এবং কোটি কোটি টাকার বেনামে সম্পদ অর্জনের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক। স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সহযোগী হিসেবে পরিচিত এই প্রকৌশলী অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকাকালীন রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজস্ব সম্পদ বৃদ্ধি করেছেন। গণপূর্তের অভ্যন্তরীণ সূত্র ও বিভিন্ন ঠিকাদারদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, আশরাফুল হক এই ১৬ বছরে ক্ষমতার একে একে সব সিঁড়ি অতিক্রম করে উচ্চ পদে অবস্থান করেছেন এবং প্রতিটি পদে এসে ঘুষ ও পার্সেন্টেজ বাণিজ্যকে আরও সুসংগঠিত করেছেন। তার কার্যক্রম এমনভাবে পরিচালিত হয়েছে যে, পুরো ই/এম জোন একটি ঘুষ-বাণিজ্যের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
আশরাফুল হক প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় ও গণভবনের দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে নিজেকে অপ্রতিরোধ্য ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সূত্র জানায়, সেই সময়ে তিনি অধিদপ্তরের পোষ্টিং ও পদোন্নতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজের প্রভাব বৃদ্ধি করেছেন। “কালু বা কাল্লু ইঞ্জিনিয়ার” হিসেবে পরিচিত আশরাফুল হকের এই রাজনৈতিক প্রভাবের ব্যবহার শুধু পদোন্নতি বা ঘুষের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সরকারি প্রকল্পের ইস্টিমেট এবং টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে তার নেপথ্য ভূমিকা ছিল বিস্তৃত। ই/এম ১নং ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ঘুষ-বাণিজ্য ও লুটপাটে প্রবেশ করেন। এরপর ৭নং ডিভিশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও এই প্রভাব বজায় রেখেছেন।
ঢাকায় তার মালিকানাধীন সম্পদগুলোতে রয়েছে একাধিক অত্যাধুনিক স্টুডিও ফ্ল্যাট, এপার্টমেন্ট এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সূত্র জানিয়েছে, তিনি বেগমপাড়ায় এপার্টমেন্ট কিনেছেন এবং কাটাবনে ৬ তলা আলীশান বাড়ি গড়ে তুলেছেন। এছাড়া এলিফ্যান্ট রোডে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ধানমন্ডিতে ৪টি এপার্টমেন্ট, গাজীপুরে রিসোর্ট, আশুলিয়া ও সাভারে কয়েক বিঘা জমি এবং বেনামে আরও বিভিন্ন সম্পদ রয়েছে।
দুই ছেলেকে কানাডায় পাঠিয়ে তিনি ইতোমধ্যেই কমপক্ষে অর্ধশত কোটি টাকা পাচার করেছেন বলে জানা গেছে। সম্পদের এই বিস্তার ও বিদেশি সংযোগে প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি ধূর্তভাবে কাজ করেছেন।
জোনে বসার পরই তিনি ঘুষের পরিমাণ বৃদ্ধি করেছেন। ঠিকাদারদের দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে প্রাক্কলন (ইস্টিমেট) পাশ করতে কমপক্ষে ৫%ু৭% অর্থ দিতে হয়। এর মধ্যে ২.৫%ু৩% সরাসরি আশরাফুল হকের কাছে যায়। বাকি ভাগ উপসহকারী প্রকৌশলী, স্টাফ অফিসার ও পিওনদের মধ্যে বিতরণ হয়।
একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঠিকাদার বলেন, “প্রকল্পের ইস্টিমেট পাশ করানোর জন্য উপসহকারী প্রকৌশলীর কাছে প্রারম্ভিক অর্থ দিতে হয়। এরপর জোন অফিসে অতিরিক্ত অর্থ জমা না দিলে ইস্টিমেট কমিয়ে দেওয়া হয় বা ক্ষতিগ্রস্থ করা হয়। এমনকি নন-সিডিউল আইটেম পাশ করাতেও অতিরিক্ত টাকা দাবী করা হয়।” অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ছাড়াও জোন অফিসের অন্যান্য স্টাফরা ঘুষ-বাণিজ্যের চক্রে জড়িত। উপসহকারী প্রকৌশলী ও স্টাফ অফিসারদের মাধ্যমে পুরো লেনদেনের হিসাব পরিচালনা হয়। প্রাক্কলনের জন্য পিওন মোজাম্মেলকেও নগদ অর্থ প্রদান করতে হয়। না দিলে তারা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে দেখা করতে দিতে না পারার হুমকি দেন। আশরাফুল হক পোষ্টিং ও পদোন্নতিতে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে অধিদপ্তরের চাকরিজীবীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছেন। সম্প্রতি তিনি নোয়াখালী অঞ্চলের এক প্রকৌশলীকে অতিরিক্ত দায়িত্বে বসানোর জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। সিনিয়র প্রকৌশলীর প্রমোশন আটকাতে বা পদোন্নতি প্রভাবিত করতে মোটা অংকের বাজেট ব্যবহার করেছেন। মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নন-ক্যাডার ই/এম প্রকৌশলীদের কাছ থেকে তিনি ২ কোটিরও বেশি অর্থ গ্রহণ করেছেন। এছাড়া ১১ জন নন-ক্যাডার প্রকৌশলীর সিনিয়রিটি নিয়ে প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব সমাধানে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। ই/এম ডিভিশনগুলোতে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে কাকে বসানো হবে বা বদলী করা হবে তা নিয়ন্ত্রণেও তিনি অর্থ হাতিয়েছে।
Leave a Reply