বিশেষ প্রতিনিধি: বছরে বছরে ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধি, টেন্ডার ছাড়াই চুক্তি নবায়ন, স্বজনপ্রীতি, অফিসে অনুপস্থিতি—সব মিলিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ ‘ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট’ প্রকল্প; রাজনৈতিক সুরক্ষায় নির্বিঘ্ন ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ পিডির বিরুদ্ধে; সুষ্ঠু তদন্তের দাবি সংশ্লিষ্টদের।
ঢাকা ওয়াসার সর্ববৃহৎ উন্নয়ন উদ্যোগ ‘ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট (DWSNIP)’ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. ওয়াজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক প্রভাব, অস্বচ্ছ চুক্তি, বাড়তি ব্যয়, আত্মীয়প্রীতি ও অফিসে অনুপস্থিতিসহ নানা অভিযোগে প্রকল্পটি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ থাকলেও প্রতিশোধের ভয়েই অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ও গোষ্ঠীসখ্যতার অভিযোগ
ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা জানান, ওয়াজ উদ্দিনের রয়েছে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন প্রভাবশালী নেতা-মন্ত্রীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। অভিযোগ রয়েছে—
কাজ না করিয়েও বিভিন্ন সময়ে বিল উত্তোলন,
মন্ত্রী-এমপিদের স্ত্রীদের নিয়মিত ‘উপহার পাঠানো’,
ছাত্রদের ওপর হামলাকারীদের আর্থিক সহায়তা,
ভারতের তামিলনাড়ু থেকে সন্ত্রাসী ভাড়া করে এনে গুলি করানোর মতো গুরুতর অভিযোগও উঠে এসেছে।
এক কর্মচারী মন্তব্য করেন, “সরকার বদল হলে তিনি সাপের মতো খোলস পাল্টে যান। প্রকাশ্যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলেন, কিন্তু ভেতরে সব জায়গা ম্যানেজ করে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেন।”
মেয়াদ ও বাজেট বৃদ্ধি—অস্বচ্ছতার অভিযোগ
২০১৬ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির প্রাথমিক বাজেট ছিল ৩৩ হাজার কোটি টাকা। পাঁচ বছর মেয়াদের প্রকল্প কয়েক দফায় বাড়তে বাড়তে গিয়ে ২০২৫ সালে গিয়ে ঠেকেছে। ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার কোটি টাকায়, অতিরিক্ত ব্যয় ৯ হাজার কোটি। বিলম্বের কারণে এডিবিকে অতিরিক্ত সুদ হিসেবে দিতে হচ্ছে ৩০০ কোটি টাকা।

ওয়াজ উদ্দিন ব্যয় বৃদ্ধি ও সময় বাড়ার জন্য ডলারের দাম ও এডিবিকে দায়ী করলেও প্রকল্প নথিতে তার উল্লেখ নেই।
টেন্ডার ছাড়া চুক্তি নবায়নের অভিযোগ
প্রকল্প নথি বিশ্লেষণে জানা যায়—
সোডেভ ডেভকন কনসাল্টিং-এর কাজ শেষ হলেও টেন্ডার ছাড়া তাদের নতুন চুক্তি দেওয়া হয়।
বেক্সিমকো কম্পিউটারস ও সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিংকে তথ্যপ্রযুক্তি ও এসসিএডিএ কাজ প্রদান—যার টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
২০২৩ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পিডির ‘একক সিদ্ধান্তে’ ২০২৫ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়।
অসম্পূর্ণ কাজ থাকা সত্ত্বেও বেক্সিমকোকে অতিরিক্ত বিল দেওয়া হয়েছে, যা থেকে পিডি ব্যক্তিগতভাবে সুবিধা পেয়েছেন—এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে।
জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পিডি পদ প্রাপ্তি
অভিযোগ আছে, সাবেক এমডি তাকসিম এ খানের ঘনিষ্ঠতা এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতির বিশেষ সুপারিশে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে ওয়াজ উদ্দিনকে পিডি করা হয়। ফলে যোগ্য প্রকৌশলীরা বঞ্চিত হন। তবে ওয়াজ উদ্দিন দাবি করেন, “আগের পিডিরা ব্যর্থ হওয়ায় আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।”
অফিসে অনিয়মিত উপস্থিতি
হাজিরা খাতার তথ্যমতে, গত বছরের নভেম্বর মাসে তিনি অফিস করেছেন মাত্র ৮ দিন।
যদিও তিনি এই তথ্য অস্বীকার করে বলেন, “আমি নিয়মিতই অফিস করি।”
ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন দখলে রাখার অভিযোগ
ওয়াসা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে সাত বছর ধরে কোনো নির্বাচন ছাড়াই তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে সংগঠনকে ব্যক্তিগত প্রভাবের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ভিন্নমতের প্রকৌশলীরা নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন।
ঢাকা সমিতির সভাপতি পদ টাকায় কেনার অভিযোগ
নতুন অভিযোগে বলা হয়েছে—
ওয়াজ উদ্দিন টাকা দিয়ে ঢাকা সমিতির সভাপতি হয়েছেন,
বিএনপি-ঘনিষ্ঠ সিবিএ ৩১৮৫ নেতাদের চাঁদা প্রদান করে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন,
এমনকি ওয়াসার একজন সচিবকে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে নিজের পদমর্যাদা নিরাপদ করেছেন।
এসব তথ্য প্রতিষ্ঠানের ভেতর নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
নির্বাচনে অর্থসাহায্যের অভিযোগ:
একাধিক কর্মকর্তা জানান, তিনি ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে, বিশেষত ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সবুরকে অর্থসাহায্য করেন। তবে এর কোনো লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের পরও কর্তৃপক্ষ নীরব:
ওয়াসা বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ে বহুবার লিখিত অভিযোগ পাঠানো হলেও কোনো কার্যকর তদন্ত হয়নি। বরং অভিযোগকারীদের হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। অনেকের ভাষায়, “ওয়াজ উদ্দিনকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক-প্রশাসনিক চক্র সুরক্ষা দিচ্ছে।”
ওয়াজ উদ্দিনের প্রতিক্রিয়া
যোগাযোগ করলে তিনি জানান—
এমডি ও পিআরও-এর অনুমতি নিয়ে কথা বলবেন,
সাংবাদিককে অফিসে চায়ের আমন্ত্রণ জানান,
এবং সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য উন্নয়ন, কিন্তু অনিয়মে প্রশ্নবিদ্ধ বাস্তবায়ন:
পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণ, ডিএমএ স্থাপন, পানি অপচয় কমানো ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হলেও নানা অনিয়ম প্রকল্পের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সুষ্ঠু তদন্তের দাবি:
একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনে করেন- “অভিযোগগুলো সত্য হলে শুধু ওয়াজ উদ্দিন নন, তাকে নিয়োগ ও সুরক্ষায় জড়িত চক্রের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।” তারা একটি স্বাধীন সরকারি তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান।
Leave a Reply